১৯ অক্টোবর ২০২৬ , ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আট মাসে পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১৫৮ কোটি ইউরো

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ১৯-১০-২০২৬
আট মাসে পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১৫৮ কোটি ইউরো ছবিঃ সংগৃহীত

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থমূল্যে এ হ্রাসের পরিমাণ প্রায় ১৫৮ কোটি ইউরো। রপ্তানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য কমে যাওয়ায় আয়েও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে ইইউ। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। এ সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। ফলে কম পরিমাণে রপ্তানির পাশাপাশি প্রতি কেজি পোশাকে কম দাম পাওয়ায় বাংলাদেশের আয় কমেছে।

তবে আট মাসের সামগ্রিক চিত্র নেতিবাচক হলেও আগস্টের পরিসংখ্যানে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের একই মাসে ইইউর মোট পোশাক আমদানির মূল্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ। এ সময়ে আমদানির পরিমাণ কমেছে শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ। বিপরীতে গড় আমদানিমূল্য বেড়েছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ। তবে এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রভাবে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো, বিশেষ করে চীন, ইউরোপের বাজারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। বাজার ধরে রাখতে তারা তুলনামূলক কম দামে পোশাকের কার্যাদেশ নিচ্ছে। এতে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা বেড়েছে। পাশাপাশি দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় রপ্তানিকারকেরা আরও চাপে পড়েছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রভাবে চীন এখন ইইউর বাজারে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাজার ধরে রাখতে দেশটি তুলনামূলক কম দামে ক্রয়াদেশ নিচ্ছে। ফলে ইউরোপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে।

তিনি বলেন, একদিকে চীনের কম দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে দেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি—এই দুই চাপে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ পণ্যের গড় রপ্তানিমূল্য কমে যাওয়া। রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় আয় ও মুনাফা প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কম দামের পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্য সংযোজিত ও বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়িয়ে পণ্যের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং বেশি মূল্য ও মুনাফা নিশ্চিত করাও এখন পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ইইউ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। এ বাজারে রপ্তানি আয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা উদ্বেগজনক এবং তা দ্রুত মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে থাকলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই পরিস্থিতির কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি নতুন বাজার অনুসন্ধান, পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দিতে হবে। ইইউর বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী চীন ও ভিয়েতনাম চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি আয় বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। দেশটি থেকে আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরো। চীনের পোশাক রপ্তানির পরিমাণও বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যদিও গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ১ দশমিক ০৪ শতাংশ।

অন্যদিকে, ভিয়েতনাম থেকে ইইউর পোশাক আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। দেশটি থেকে আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ইউরো। এ সময়ে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। তবে গড় রপ্তানিমূল্য ১০ দশমিক ১১ শতাংশ বাড়ায় দেশটির মোট রপ্তানি আয় বেড়েছে। অর্থাৎ, চীন রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে আয় বাড়িয়েছে, আর ভিয়েতনাম কম পরিমাণে রপ্তানি করেও বেশি দাম পাওয়ায় আয় বাড়াতে পেরেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রপ্তানির পরিমাণ ও গড় রপ্তানিমূল্য—দুটিই কমেছে। ফলে দুই দিক থেকেই রপ্তানি আয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশের আয় কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে তুরস্কের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ। দেশটি থেকে ইইউর আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫১০ কোটি ইউরো। একই সময়ে ভারতের রপ্তানি আয় কমেছে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১১ দশমিক ০৩ শতাংশ। এ ছাড়া পাকিস্তানের রপ্তানি আয় কমেছে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ১০ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।

দেশগুলোর রপ্তানি পরিস্থিতিতেও ভিন্নতা রয়েছে। পাকিস্তানের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়লেও গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কম্বোডিয়ার রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, তবে গড় রপ্তানিমূল্য বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ